মাশরুম খাওয়ার নিয়ম-মাশরুম খেলে কি হয়?

মাশরুম খাওয়ার নিয়ম-মাশরুম খেলে কি হয়? এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে আজকের এই পোস্টটিতে। বর্তমান সময়ে স্বাস্থ্যকর খাদ্য ও স্বল্প পুঁজিতে লাভজনক কৃষি উদ্যোগ হিসেবে মাশরুম মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
পুষ্টিগুণে ভরপুর এই ছত্রাকজাত খাদ্য যেমন শরীরের জন্য উপকারী, তেমনি সঠিকভাবে চাষ করলে এটি হতে পারে একটি সম্ভাবনাময় আয়ের উৎস। বিস্তারিত জানতে আরর্টিকেলটির সাথেই থাকুন।

মাশরুম খাওয়ার নিয়ম 


মাশরুম খাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। প্রথমত, সবসময় চাষকৃত ও নিরাপদ প্রজাতির মাশরুম খেতে হবে। বাজারে পাওয়া অয়েস্টার, বাটন বা শিটাকে মাশরুম সাধারণত নিরাপদ। 

কখনোই জঙ্গল বা রাস্তার পাশে জন্মানো বন্য মাশরুম খাওয়া উচিত নয়, কারণ সেগুলো বিষাক্ত হতে পারে। মাশরুম রান্নার আগে ২–৩ বার পরিষ্কার পানিতে ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে, যাতে ময়লা বা জীবাণু দূর হয়।

মাশরুম কাঁচা খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত, কারণ কাঁচা বা অর্ধসিদ্ধ মাশরুম হজমে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। সবসময় ভালোভাবে সিদ্ধ বা ভেজে খাওয়াই নিরাপদ।

রান্নার সময় খুব বেশি তেল ও ঝাল ব্যবহার না করাই ভালো। মাশরুম ভাজি, ঝোল, স্যুপ কিংবা ডিম ও সবজির সঙ্গে রান্না করে খাওয়া যায়। খাওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো দুপুর বা রাতের খাবার। খালি পেটে মাশরুম না খাওয়াই উত্তম।

পরিমাণের দিক থেকে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য এক বেলায় ১০০–১৫০ গ্রাম মাশরুম যথেষ্ট। সপ্তাহে ২–৩ দিন মাশরুম খাওয়া স্বাস্থ্যসম্মত বলে বিবেচিত।

মাশরুম খেলে কী হয়?


সঠিক নিয়মে মাশরুম খেলে শরীরের নানা উপকার হয়। মাশরুমে রয়েছে উচ্চমাত্রার প্রোটিন, যা শরীরের পেশি গঠন ও শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এতে প্রচুর ফাইবার থাকায় হজম প্রক্রিয়া উন্নত হয় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়।

মাশরুমে কোলেস্টেরল ও চর্বি খুব কম, তাই এটি হৃদরোগীদের জন্য উপকারী। ডায়াবেটিস রোগীরাও পরিমিত মাত্রায় মাশরুম খেতে পারেন, কারণ এতে প্রাকৃতিকভাবে চিনি কম থাকে। এছাড়া এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।

ভিটামিনের মধ্যে মাশরুমে ভিটামিন বি কমপ্লেক্স ও ভিটামিন ডি পাওয়া যায়, যা হাড় মজবুত রাখা এবং স্নায়ুতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত মাশরুম খেলে ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং শরীর সতেজ থাকে।

তবে অতিরিক্ত বা ভুলভাবে খেলে পেটের সমস্যা দেখা দিতে পারে, তাই পরিমিত ও নিয়ম মেনে খাওয়াই উত্তম।

মাশরুমের বীজ উৎপাদন 

মাশরুম চাষের জন্য যে বীজ ব্যবহৃত হয় তাকে স্পন (Spawn) বলা হয়। এটি মূলত জীবাণুমুক্ত শস্যের ওপর মাশরুমের মাইসেলিয়াম জন্মানো অবস্থা। স্পন উৎপাদন একটি সংবেদনশীল প্রক্রিয়া, যেখানে পরিচ্ছন্নতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

স্পন তৈরির জন্য সাধারণত গম বা ধান ব্যবহার করা হয়। প্রথমে শস্য ভালোভাবে ধুয়ে ১২ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়। এরপর ১০–১৫ মিনিট সিদ্ধ করে পানি ঝরিয়ে নিতে হয়, যাতে দানাগুলো নরম হলেও ফেটে না যায়।

পরে শস্য ঠান্ডা করে কাঁচের বোতল বা পিপি ব্যাগে ভরে প্রেসার কুকারে জীবাণুমুক্ত করা হয়। ঠান্ডা হলে এর মধ্যে নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে সংগ্রহ করা মাশরুম কালচার বা মাদার স্পন দেওয়া হয়।

এই বোতল বা ব্যাগগুলো ২২–২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় অন্ধকার ও পরিষ্কার স্থানে ১০–১৫ দিন রেখে দিলে শস্যের উপর সাদা মাইসেলিয়াম ছড়িয়ে পড়ে। সম্পূর্ণ সাদা হয়ে গেলে সেটিই ব্যবহারযোগ্য মাশরুমের বীজ।

মাশরুম চাষের উপায় 


বাংলাদেশে ঘরে বা বাণিজ্যিকভাবে চাষের জন্য অয়েস্টার মাশরুম সবচেয়ে জনপ্রিয়। এই চাষের জন্য ধানের খড় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। প্রথমে খড় ১–২ ইঞ্চি করে কেটে ১২ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়। পরে পানি ঝরিয়ে নিতে হয়।

এরপর ছিদ্রযুক্ত পলিথিন ব্যাগে স্তরে স্তরে খড় ও মাশরুমের বীজ দেওয়া হয়। ব্যাগের মুখ ভালোভাবে বেঁধে পরিষ্কার ও বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় ঝুলিয়ে রাখা হয়। ১০–১৫ দিনের মধ্যে ব্যাগের ভেতর পুরোটা সাদা হয়ে যায়।

এরপর ব্যাগে হালকা আলো ও বাতাস দিতে হয় এবং দিনে ২–৩ বার পানি স্প্রে করতে হয়। ৫–৭ দিনের মধ্যেই মাশরুম বের হতে শুরু করে। এক একটি ব্যাগ থেকে ৩–৪ বার ফলন পাওয়া যায়।

মাশরুমের ক্ষতিকর দিক 

যদিও মাশরুম উপকারী খাদ্য, তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি ক্ষতিকরও হতে পারে। কাঁচা বা কম রান্না করা মাশরুম খেলে পেট ব্যথা, বমি বা ডায়রিয়া হতে পারে। অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে গ্যাস্ট্রিক ও বদহজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মাশরুমে অ্যালার্জি থাকতে পারে, যার ফলে চুলকানি, ফুসকুড়ি বা শ্বাসকষ্ট হতে পারে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো বন্য বা অপরিচিত মাশরুম খাওয়া, যা মারাত্মক বিষক্রিয়ার কারণ হতে পারে এবং জীবননাশের আশঙ্কাও থাকে।

তাই সবসময় নিরাপদ উৎসের মাশরুম খাওয়া অত্যন্ত জরুরি।

মাশরুমের অর্থনৈতিক গুরুত্ব 


মাশরুমের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বর্তমানে অত্যন্ত বেশি। অল্প জায়গা ও অল্প পুঁজিতে চাষ করা যায় বলে এটি একটি লাভজনক কৃষি উদ্যোগ। মাত্র ২৫–৩০ দিনের মধ্যেই ফলন পাওয়া যায়, যা দ্রুত আয় নিশ্চিত করে।

মাশরুম চাষের মাধ্যমে গ্রামীণ বেকার যুবক-যুবতী ও নারীরা ঘরে বসে আয়ের সুযোগ পায়। এছাড়া ধানের খড়ের মতো কৃষি বর্জ্য ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব উপায়ে খাদ্য উৎপাদন সম্ভব হয়।

বর্তমানে হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও সুপারশপে মাশরুমের চাহিদা বাড়ছে। শুকনো মাশরুম, পাউডার, স্যুপ ইত্যাদি ভ্যালু অ্যাডেড পণ্য তৈরি করে আরও বেশি লাভ করা যায়। ভবিষ্যতে রপ্তানির ক্ষেত্রেও মাশরুম একটি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে বিবেচিত।

উপসংহার


সব মিলিয়ে বলা যায়, মাশরুম একটি পুষ্টিকর খাদ্য এবং একই সঙ্গে একটি লাভজনক কৃষি পণ্য। সঠিক নিয়মে খেলে এটি স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী এবং সঠিকভাবে চাষ করলে অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভরতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url